টোকাই দিয়ে ব্যানার পোস্টার লাগিয়ে নেতা হওয়া যায় না: ওবায়দুল কাদের
সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন সম্পন্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত হয়েছে : ৯:৪৪:০৪,অপরাহ্ন ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | সংবাদটি ৬৩২ বার পঠিত
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দলে কর্মি কমে যাচ্ছে, নেতা বেড়ে যাচ্ছে। টোকাই দিয়ে ব্যানার পোস্টার লাগিয়ে নেতা হওয়া যায় না। আবার টাকা দিয়েও আওয়ামী লীগের নেতা হওয়া যায় না। নেতা হতে হলে কর্মিবান্ধব হতে হবে। কর্মি সৃষ্টি করতে হবে। আওয়ামী লীগ মৌসুমী নেতা চায় না, ত্যাগী নেতা চায়। বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) দুপুরে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সেতু মন্ত্রী বলেন, কর্মি দেখি না, চারদিকে শুধু বিলবোর্ড দেখি, সুন্দর ছবিও দেখি। কিন্তু সুন্দর ছবি দিয়ে বিলবোর্ড বানিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা হবেন। এইসবের টাইম নাই। দূর্নীতিবাজ, সন্ত্রাস, লুটতরাজ সকলে সাবধান, কারন আপনাদের জন্য সামনে আছে শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযান। কারন দেশ এখন আওয়ামী লীগের। তিনি বলেন, কোন কমিটিতে দলাদলি মেনে নেয়া যাবে না। কারণ আমরা আওয়ামী লীগে কোন সুবিধাবাবাদীদের স্থান নেই। টাকা দিয়ে আওয়ামী লীগের পদ কেনা যায় না। তাই যারা মনোনয়ন বাণিজ্য করেন তাদেরকে হুশিয়ার করে দিচ্ছি ভালো হয়ে যান। কোন পকেট কমিটি আওয়ামী লীগ মেনে নেবে না। আমরা দেশকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত করতে সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। তাই প্রত্যেকটি কমিটি প্রবীনের সাথে নবীনের মিলন হবে।
ওবায়দুল কাদের বক্তব্যের শুরুতেই সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় সবার উদ্দ্যেশে বলেন, ‘ভালা নি, ভালা নি’ উপস্থিত সবাই উত্তরে বলেন ‘আমরাও ভালা’। কাদের কুড়ি মিনিটের বক্তব্যে বলেন, সিলেটের প্রয়াত সকল নেতাকর্মিদের স্মরণ করেন তিনি। জীবনের জয় গান গায় উল্লেখ করে কাদের বলেন, আমরা অন্ধকারে আলোর মশাল জ্বালাই। আমরা আওয়ামী লীগ দূর্নীতি ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এগিয়ে যাই। পুস্পিত আলোকিত পতাকা হাতে এগিয়ে যাই। মন্ত্রী বলেন, বিশ্বের তিনজন সৎ প্রধানমন্ত্রীর একজন শেখ হাসিনা। বিশ্বের ১০ জন প্রভাবশালীর প্রধানমন্ত্রীর একজন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ প্রাপ্ততা আমাদের গর্ব। তিনি বলেন, গত ৪৪ বছরে জনপ্রিয় দক্ষ নেতার নাম শেখ হাসিনা। জনবান্ধব সরকারের নাম শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে কর্মিবান্ধব হয়ে দলকে সুসংগঠিত করতে হবে।
এরআগে দুপুর ১২ টা ৩১ মিনিটে প্রথম পর্বে জাতীয় সংগীতের সাথে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্যে দিয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি। এসময় শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়ানো হয়। পরে কোরআন তেলাওয়াত, গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিঠকও পাঠের মাধ্যমে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর জেলা আওয়ামী লীগ কতৃক প্রকাশিত স্মারক মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে আওয়ামী লীগকে বাঁচাতে হবে। আর বাংলাদেশকে বাঁচতে হলে শেখ হাসিনাকে বাঁচতে হবে। ঐতিহ্যের সাথে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে ২০২১ সালে উন্নয়নশীল দেশের মডেলে দেশকে তৈরি করতে আওয়ামী লীগকে নতুন ভাবে সাজানো হবে।
সম্মেলন ঘিরে সকাল থেকেই নেতাকর্মীরা খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে আলিয়া মাদরাসা মাঠে জড়ো হতে শুরু করেন। বর্ণিল প্ল্যাকার্ড ফেস্টুন নিয়ে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তুলেন সম্মেলনস্থল। এতে জয় বাংলা আর নিজেদের নেতাদের নামে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে আলীয়া মাদ্রাসা মাঠ। আর নৌকার আদলে তৈরি করা মঞ্চে ৭ মার্চের ভাষণের পর চলে ফোক গান। সেই গানের সাথেও তাল মেলান নেতাকর্মীরা। বিকেল সাড়ে তিনটায় সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়। পরে জেলা ও মহানগর কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ৩২ প্রার্থীকে সমঝোতার জন্য ২০ মিনিট সময় বেধে দেয়া হয়। আসরের আযান ও নামাজের বিরতির পর ফের মঞ্চে আসেন ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। এসময় সকলে শেখ হাসিনার উপর ভরসা রাখায় দলীয় নেত্রীর দেয়া দুই কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন কাদের।
সম্মেলনে প্রধান বক্তার বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। বক্তব্যে তিনি বলেন, সম্মেলন মানেই হচ্ছে কর্মিদের মিলন মেলা। আজকের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সিলেটকে যে বর্ণিল সাজে সেজেছে। কিন্তু সম্মেলনে শৃঙ্খলার ঘাটতি ছিলো। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ শৃঙ্খল শেখার দল, আওয়ামী লীগ করতে হলে শৃঙ্খলা শিখতে হবে। আমি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সম্মেলনে গেছি, কিন্তু এতো বিশৃঙ্খলা দেখিনি। এতো চমৎকার একটি আয়োজনে শৃঙ্খলা না থাকার কারনে কিছু কষ্ট রয়ে গেল। তিনি বলেন, সম্মেলনে দলের নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে মিলনমেলা হয়েছে। কিন্তু দলের নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খল হতে হবে। সম্মেলনে বিভিন্ন নেতাদের অনুসারীদের স্লোগান দেখেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন হানিফ। তিনি বলেন, স্লোগান দিয়ে কাউকে নেতা বানাতে পারবেন না। বরং দলের জন্য, দেশের জন্য কাজ করতে হবে। হানিফ বলেন, আওয়ামী লীগে বারবার আঘাত এসেছে, ষড়যন্ত্র এসেছে। এখনো ষড়যন্ত্র চলছে। অনুপ্রবেশকারীদের কারনে আওয়ামী পরিবারে কিছুটা বিভক্তি দেখা দিয়েছে। কিন্তু তৃণমুলের নেতারা এখনো সংঘবদ্ধ। আর তাদেরকে সাথে নিয়ে সকল ষড়যন্ত্র ও বাঁধা ডিঙিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। বক্তব্যে নাহিদ বলেন, আওয়ামী লীগ এশিয়া মহাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এই দলের নেতৃত্বে সোনার বাংলা গড়তে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। তার ধারাবহিকতায় একটি দারিদ্র দেশ থেকে একটি উন্নয়নশীল দেশে যাত্রা শুরু করেছে। তিনি বলেন, সম্মেলন মানেই দলকে সুসংগঠিত করা। এজন্য দলের দায়িত্ববানরা দক্ষ নেতৃত্বে দেশের তরে কাজ করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন বলেন, ঐতিহাসিক দিনে ঐতিহাসিক সম্মেলন হলো সিলেটে। সামনে অনেক কাজ আমাদের। পৃথিবীর সব দেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করা হবে। যারা নতুন নেতৃত্বে আসবে তারা দেশের কল্যাণে কাজ করবেন। তিনি বলেন, গত এক দশকে দেশের ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। সিলেটে যত উন্নয়ন দরকার বলবেন শেখ হাসিনা তা করে দেবেন। তিনি বলেন ই- পাসপোর্ট আগামী ১৫ ডিসেম্বর থেকে চালু করা হবে। বেকার যুবকদের দক্ষ করে তাদের কাজে লাগাতে কয়েক হাজার টাকা বরাদ্ধ দেয়ো হয়েছে।
এরআগে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, পূণ্যভূমি সিলেট আওয়ামী লীগের রাজনীতি অনেক শক্তিশালী। আর সিলেটের আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হলে সারা দেশের আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়। তিনি বলেন, ইতিবাচক রাজনীতির শক্ত ভীত সিলেটে। এসময় তিনি সিলেটের প্রয়াত সকল নেতাদের স্মরণ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন। তিনি বলেন, বিএনপি হলো চুরের পার্টি। আর চোরের মাতা বেগম খালেদা জিয়া। আর খুনি তারেক জিয়া এখন দেশের বাইরে থেকে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এই চোরের দলকে সিলেট আওয়ামী লীগ সিলেট থেকে বিতাড়িত করেছে। যে দলের অস্থিত্ব সিলেট থেকে বিলিন হয়েছে। তিনি তরুণদের উদ্দ্যেশে বলেন, যে তারুণ্য ধ্বংস করে তাদের চায় বিএনপি আর যে তারুণ্য সৃষ্টি করতে জানে তাদেরকে চায় আওয়ামী লীগ।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্ঠামন্ডলীর সদস্য ড. ইনাম আহমদ চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, অধ্যাপক মো. রফিকুর রহমান, তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ। সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন পরিচালনা করেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। শুরুতেই সম্মেলনে জেলা ও মহানগরের সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন তারা।
এরআগে বেলা ১২টার দিকে ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকা থেকে বিমানযোগে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।









