করোনা: সিলেটে রাত-দিন বিনামূল্যে রোগী পরিবহন করছে শেইড অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস
টাইম সিলেট ডট কম
প্রকাশিত হয়েছে : ৯:২৬:২২,অপরাহ্ন ০৮ জুলাই ২০২১ | সংবাদটি ৪২২ বার পঠিত
কারও প্রয়োজন অক্সিজেন, আবার কারও প্রয়োজন খাবার। হাসপাতালে যেতে কারও প্রয়োজন পড়ছে অ্যাম্বুলেন্সের, আবার কারও প্রয়োজন স্বজনের মরদেহ বাড়ি নিয়ে যাবার। যখনই এমন কোন প্রয়োজনে ডাক পড়ে তখনই কালক্ষেপন না করে প্রয়োজন মেটাতে ছুটে যান সিলেট হেলথ ডেভেলপম্যান্ট এন্ড এডুকেশন ট্রাস্ট (শেইড) এর স্বেচ্ছাসেবীরা।
এসব প্রয়োজন ছাড়াও শেষ বিদায়ের যাত্রার প্রয়োজনেও হাজির হন তারা। করোনার ভয়ে নিকটাত্মীয়ের শেষ বিদায়ে স্বজনরা অংশ না নিলেও জানাযা থেকে শুরু করে দাফন; আপনজনের মতোই নিজ দায়িত্বেই সম্পন্ন করছেন তারা।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হতেই সিলেটে দীর্ঘ হতে থাকে আক্রান্তের সংখ্যা। বাড়তে থাকে মৃত্যুর মিছিলও। সরকার ঘোষিত লকডাউনের কারণে সড়কে নেই যান চলাচল। আর হাতেগোনা যানবাহন চলাচল করলেও ভয়ে পরিবহন করা হয় না করোনা আক্রান্ত কিংবা উপসর্গের রোগী, যে কারণে হাসপাতালে যেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাদের।
এমন পরিস্থিতিতে রাত-দিন বিনামূল্যে রোগী পরিবহন দিয়ে আসছে শেইড অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস। একই ভাবে করোনার এ মহামারিকালে মরদেহ পরিবহন, মৃতদের দাফন ও সৎকার, বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ, বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ, দরিদ্র ও অসহায়দের খাদ্য সহায়তা প্রদানও করে আসছে সংগঠনটি।
গত বছরের মে মাসে মহামারির ধাক্কায় সারাদেশের মতো যখন সিলেটবাসীও দিশেহারা, তখনই অসুস্থদের হাসপাতালে পৌঁছে দেবার তাগিদ থেকে ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়ে এগিয়ে আসেন সিলেটের বিশিষ্ট আবাসন ব্যবসায়ী মুহাম্মদ দিলওয়ার হোসাইন।
শুরুর দিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভাড়ায় চালিত গাড়িতে করে রোগীদের সেবা প্রদান করলেও পরবর্তীতে একই বছরের জুন মাসে ভাষা সৈনিক ও কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ মাসউদ খানকে চেয়ারম্যান করে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসাবে শেইড ট্রাস্টের যাত্রা শুরু হয়। আর ট্রাস্টে যুক্ত হয় নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সও।
শেইড-এর ম্যানেজিং ট্রাস্টি মুহাম্মদ দিলওয়ার হোসাইন জানান, ‘করোনা মহামারি শুরু হবার পর গত বছরের ৫ মে থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের কার্যক্রম চালু হয়। পরবর্তীতে এ সার্ভিসকে স্থায়ী রূপদান করতে ট্রাস্ট গঠন করা হয়। ট্রাস্টের অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ৩৫৮ জন রোগী পরিবহন করা হয়েছে। দশটি লাশের জানাজা ও দাফন হয়েছে। ৭৬টি লাশ বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, ‘এ পর্যন্ত ১৫০ জনকে বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা প্রদান, ১ হাজার পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা বিতরণ এবং ট্রাস্টের স্বনির্ভর প্রজেক্টের আওতায় সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় ১০টি পরিবারের মাঝে ছাগল ও সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়েছে।’
শেইড ট্রাস্টের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান ও মেট্রোপলিটন চেম্বারের সাবেক পরিচালক মুহাম্মদ মুনতাসির আলী বলেন, ‘প্রথমদিকে ভাড়া গাড়ীর মাধ্যমে রোগীদের সেবা প্রদান করা হচ্ছিল। পরবর্তীতে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসাবে ট্রাস্টের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ট্রাস্টের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের মাধ্যমে করোনা আক্রান্ত/উপসর্গের রোগীদের পরিবহন করা হচ্ছে। অক্সিজেন সরবরাহ, খাদ্য সরবরাহও করা হচ্ছে। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবীরা মৃতের দাফন কার্যও সম্পাদন করছেন।’
তিনি আরও জানান, এ ট্রাস্টের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবার খাতকে আরও এগিয়ে নিতে যেতে একটি অলাভজন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে। সর্বোপরি আর্থ মানবতার সেবা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিই এ ট্রাস্টের মূল লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও শেইড ট্রাস্টের স্বেচ্ছাসেবীরা দিনরাত ২৪ ঘন্টা অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসসহ সবধরনের সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন। কোভিট-১৯ আক্রান্ত রোগী ছাড়াও অসহায় দরিদ্র রোগীরা সার্বক্ষণিক ০১৭৭২-২৫৫০৫৪ ও ০১৭৭০-১৩০২৩৩ এ দু’টি মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করে বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাবেন বলে জানান তারা।
শেইড ট্রাস্টের স্বেচ্ছাসেবী ও দায়িত্বশীল জাহিদ আহমদ জানান, প্রতিদিনই অ্যাম্বুলেন্সে তিনটি করোনা কিংবা উপসর্গের রোগী পরিবহন করছেন। তিনি বলেন, লকডাউনে রোগী পরিবহনের চাপ আরো বেড়েছে। ‘ঝুঁকি জেনেও তারা করোনা আক্রান্তদের হাসপাতালে পৌঁছে দিতে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকেন। পাশাপাশি দাফন-কাফন কিংবা মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর জন্যও ডাক পড়ে তাদের। মূলত মানবিক মূল্যবোধ থেকেই এমন দুর্যোগ মুহুর্তে তারা স্বেচ্ছায় সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন। আর এতেই তারা প্রকৃত সুখ খুঁজে পান বলেও জানান।’









