ওয়াশিংটন এবং মস্কোর সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে পাকিস্তান -বাংলাদেশ
টাইম সিলেট ডট কম
প্রকাশিত হয়েছে : ৭:৩৪:১৯,অপরাহ্ন ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | সংবাদটি ১৭৭ বার পঠিত
আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া আয়োজিত বহুপাক্ষিক আলোচনা এড়িয়ে গেছে পাকিস্তান। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতও এতে অংশগ্রহণে আপত্তি জানিয়েছে, তবুও বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন যে পাকিস্তানের পদক্ষেপ মস্কোকে আরও বেশি ক্ষুণ্ন করেছিলো। একদিকে যখন রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করেছে ইসলামাবাদ, বিশেষ করে সস্তা তেল আমদানির কথা মাথায় রেখে, সেখানে ইসলামাবাদের আলোচনা এড়িয়ে যাবার বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ প্রকাশ করে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে ইসলামাবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিচলিত না করার জন্যই এই পদক্ষেপ করেছে, কারণ আমেরিকা অর্থনৈতিক সঙ্কটে জর্জরিত দেশকে মুক্ত করার জন্য বিশ্বব্যাপী ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। বাংলাদেশও সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার খেলা খেলছে – একদিকে সুবিধা অর্জন করা এবং একই সাথে দুই শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়ানো। ভারতের সাথে সরাসরি সংযুক্ত না হলেও, এর পিছনে এই কৌশলগুলি দিল্লির পররাষ্ট্র নীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে, কারণ ভারত নিজেই ওয়াশিংটন এবং মস্কোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে।
পাকিস্তান গত এক বছরে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করেছে, বিশেষ করে ছাড়ের রাশিয়ান তেল আমদানির দিকে নজর রেখে। প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মধ্যে জ্বালানির জ্বালায় থাকা নাগরিকদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে, পাকিস্তান এবং রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই কৌশলগত অংশীদার। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ মার্কিন-পন্থী হলেও তার পূর্বসূরি, ইমরান খান – যিনি এপ্রিলে অফিস ছেড়েছিলেন – রাশিয়ার কাছাকাছি এসেছিলেন। ২৩ বছরের মধ্যে ২০২২ সালে, খান মস্কো সফরকারী প্রথম পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন – যে সময়ে ইউক্রেন আক্রমণের জন্য রাশিয়া সমালোচিত হয়েছিল।
খান, যিনি রাশিয়ান তেল আমদানির বিরুদ্ধে আমেরিকান চাপ প্রতিরোধ করার জন্য বারবার ভারতের প্রশংসা করেছেন, মঙ্গলবারও দাবি করেছেন যে তিনি যুদ্ধের বিষয়ে রাশিয়া বিরোধী অবস্থান জোরদার করার জন্য তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার প্রচেষ্টাকে বাধা দিয়েছিলেন। খান বলেন, “বাজওয়া আমাকে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা করতে বলেছিলেন। আমি তাকে বলেছিলাম যে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র হয়ে নিরপেক্ষ রয়েছে। তাই পাকিস্তানকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। ” ২০২২ সালের এপ্রিলে, তার সরকার পতনের সাথে সাথে, খান ওয়াশিংটনকে তাঁর শাসন পরিবর্তনের জন্য অভিযুক্ত করেছিলেন। এই পটভূমিতে, পাকিস্তান রাশিয়া-আয়োজিত বৈঠকটি এড়িয়ে যাচ্ছে – তার আনুষ্ঠানিক ন্যায্যতা সত্ত্বেও যে ভারত ফোরামে তার নিজস্ব এজেন্ডা ঠেলে দিতে পারে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তান ইউক্রেনে প্রাণঘাতী সামরিক হার্ডওয়্যার সরবরাহ করেছে বলে জানা গেছে। ২০২২-এর মাঝামাঝি সময়ে, যুক্তরাজ্যের বিমান বাহিনীকে কিইভের জন্য এয়ারলিফ্টিংয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়া হয়। ইউক্রেনে প্রাণঘাতী সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী কয়েকটি অ-পশ্চিমা দেশগুলির মধ্যে পাকিস্তানও জায়গা করে নিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুড বুকে পাকিস্তান
উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যানের মতো বিশেষজ্ঞরা বলছেন -রাশিয়ার সাথে ভাল সম্পর্ক এবং সস্তা তেলের সরবরাহ সত্ত্বেও মুদ্রা তহবিলে বেলআউট পাবার আকাঙ্ক্ষা থেকে ওয়াশিংটনকে চটাতে চাইছে না পাকিস্তান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সংস্থার উপর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় তহবিল প্রয়োজন। একইভাবে একজন প্রাক্তন ভারতীয় কূটনীতিক এম কে ভদ্রকুমার শনিবার যুক্তি দিয়েছিলেন যে ইসলামাবাদ ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহের কথা উল্লেখ করে “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় রাশিয়ার পিছনে ছুরি চালাচ্ছে”। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত হোসেন হাক্কানি জুন মাসে লিখেছেন যে তার অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় ইসলামাবাদকে পশ্চিমের সাথে তার অবনতিশীল সম্পর্ক ঠিক করতে হবে।হাক্কানি দ্য প্রিন্টে লিখেছেন-” অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে পাকিস্তানকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় অংশীদারদের সাথে সম্পর্ক মেরামত করতে হবে। ”জুন মাসে সেনাপ্রধান বাজওয়া বেলআউট কিস্তির তাড়াতাড়ি মুক্তি পেতে আমেরিকার সাহায্য চেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এর ফলে মস্কো এখন পাকিস্তানের পদক্ষেপের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে উঠেছে। ভারতে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ ৬ ফেব্রুয়ারি বলেছিলেন যে রাশিয়া ইউক্রেনে পাকিস্তানি অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি “নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ” করছে। যদিও রাশিয়া এখনও পাকিস্তানের সাথে সহযোগিতা বাড়ানোর আশা করছে, পাশাপাশি আলিপভ দীর্ঘস্থায়ী অংশীদার ভারতের তাদের ঘনিষ্ঠতা সম্বন্ধে উদ্বেগ দূর করতে চেয়েছিল যা একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।আলিপভ বলেছেন, -”পাকিস্তানের সাথে আমাদের সম্পর্ক ঠিক রাখতে আমরা কখনই ভারতের জন্য ক্ষতিকর কিছু করব না। ”
পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশও দুই মহাশক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করছে। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়ার সমর্থনের কথা মাথায় রেখে মস্কো এবং ঢাকা কয়েক দশক ধরে শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভাগ করে নিয়েছে। বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস রাশিয়া। বাংলাদেশ তার ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়া বাংলাদেশকে ১২.৬ বিলিয়ন ডলারের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সহায়তা করছে। ফলে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় না বাংলাদেশ। আর তাই বাংলাদেশ গত এক বছরে ইউক্রেনে খাদ্য বা আর্থিক সাহায্য পাঠানো এড়িয়ে গেছে। এমনকি মার্চ মাসে ইউক্রেনের একটি বন্দরে ডক করা বাংলাদেশি জাহাজে রাশিয়ান মিসাইলের আঘাত সত্ত্বেও প্রতিবাদ করেনি ঢাকা। বিপরীতে মানবাধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারকে চাপ দিয়েছে। ডিসেম্বরে, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের বেশ কয়েকজন প্রাক্তন এবং বর্তমান নেতাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিষেধাজ্ঞার আওতায় ফেলা হয়েছিলো। র্যাব হল বাংলাদেশের একটি অভিজাত আধাসামরিক ইউনিট যা সরকারের পক্ষে থেকে দেশে বলপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয় আমেরিকান রাষ্ট্রদূত পিটার হাস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে কথিত গুমের শিকার হওয়া পরিবারের সাথে দেখা করেছেন। এর মধ্যে বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের পরিবারও রয়েছে। প্রত্যাশিতভাবে, রাশিয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে হাসিনার পাশে দাঁড়িয়েছিলো। বুধবার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাউন্সেলর ডেরেক চোলেট সতর্ক করেছিলেন যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি আমেরিকান সহযোগিতাকে সীমিত করবে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার কথা হাসিনাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। এই রাজনৈতিক আবহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শফি মোঃ মোস্তফা, পরামর্শ দিয়েছেন যে দুটি শক্তি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের বিপরীত দিকে বাজি ধরছে। মোস্তফা জানুয়ারিতে দ্য ডিপ্লোম্যাটে লিখেছিলেন- ”যখন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, তখন উল্টোদিকে চীন ও রাশিয়া হাসিনার সরকারকে আর্থিক সহায়তা সহ নিঃশর্ত সমর্থন দিচ্ছে। ”
এসব বিবেচনা সত্ত্বেও, হাসিনার সরকার ওয়াশিংটনের অর্থনীতির কথা মাথায় রেখে পুরোপুরি বিরোধিতার রাস্তায় হাঁটেনি। ২০২১ সালের হিসাবে যেখানে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মূল্য ১.১বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১০.৬ বিলিয়ন – প্রায় ১০ গুণ বেশি। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের শীর্ষ আমদানিকারক এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান উৎস। ভারসাম্য বজায় রাখতে ডিসেম্বরে, বাংলাদেশ রূপপুর প্রকল্পের জন্য সরঞ্জাম বহনকারী একটি রাশিয়ান জাহাজকে ডকিং থেকে আটকে দিয়েছিলো, যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলে জাহাজটিকে ডকিং -এর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিলো। ইউক্রেন যুদ্ধের বিপরীতে এই প্রথম বাংলাদেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ করছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ জানায় অন্য জাহাজ ব্যবহার করে পণ্যবাহী বন্দরে স্থানান্তর করা হবে। কিন্তু, জাহাজটি অবশেষে সরঞ্জামগুলি না রেখেই ফিরে আসে। সোমবার, বাংলাদেশ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সাথে সঙ্গতি রেখে ৬৯ টি রাশিয়ান জাহাজকে তার সামুদ্রিক জলসীমা এড়াতে নির্দেশ দিয়েছে , এটি জেনেও রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে। কুগেলম্যানের মতে, এটি ঢাকার দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার উপায়।কুগেলম্যান বেনারনিউজকে বলেন, ” ঢাকা মস্কোর সাথে সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আগ্রহী,সেইসঙ্গে রাজনীতিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিষয়ে তার অসন্তুষ্টির ইঙ্গিত দিতেও ভয় পায় না। আবার রাশিয়ান জাহাজ নিয়ে হাসিনার অবস্থান প্রতিফলিত করে ঢাকা ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়।” এত বড় শক্তির ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিবেশীদের অবস্থান ভারতের জন্যও চিন্তার বিষয়। দিল্লি মস্কোর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক শেয়ার করলেও, রাশিয়া-চীনা অংশীদারিত্বের কারণে বাংলাদেশে রাশিয়ার প্রভাব উদ্বেগজনক। এই অঞ্চলের প্রধান শক্তি হিসাবে, ভারত তার প্রতিবেশী অঞ্চলে চীনকে স্থান দিতে চায় না যদি এর জন্য আমেরিকার সহায়তা নেওয়ার দরকার হয়, ভারত তা নিতেও প্রস্তুত ।








